এম.জাহিদ ।। বরিশাল নগরীর হাসপাতাল রোডের ল’কলেজ কম্পাউন্ড নগরীর অন্যতম শান্তিপূর্ণ আবাসিক এলাকা। কিন্তু একই এলাকার ভূঁইয়া পরিবারে গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলমান অভ্যন্তরীণ উত্তেজনা এবার চরম সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। গত ২৩ নভেম্বর রাতে এক বাসায় হামলা, লুটপাট, শ্লীলতাহানি ও নির্যাতনের ঘটনায় আবার সামনে এসেছে দুই ভাই,সজল ভূঁইয়া ও উজ্জ্বল ভূঁইয়ার নাম। পরিবারের সদস্য, প্রতিবেশী, নথিভুক্ত মামলা ও সাক্ষ্য বলছে, এই দুই ভাই বহু বছর ধরে এলাকায় প্রভাব বিস্তার ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছিলেন।
সেদিন রাত সাড়ে ৯টার দিকে সাবেরা সুলতানা চৌধুরীর ফ্ল্যাটে প্রবেশ করে সজল, উজ্জ্বল ও তাদের সহযোগীরা। অভিযোগ অনুযায়ী,
সজলের হাতে ছিল দেশীয় দা,
উজ্জ্বলের হাতে ছিল লোহার রড,
অন্যদের হাতে হাতুড়ি ও লাঠি।
পরিবারের সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন সোহেলকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি মারধর করা হয়। বাদীদের বক্তব্য,
সজল দা–এর উল্টো পিঠ দিয়ে আঘাত করেন,
উজ্জ্বল রড দিয়ে আঘাত করেন,
পরে সোহেলকে একটি ঘরে আটকে রেখে নির্যাতন চালানো হয়।
এ সময় তার কাছে থাকা ২২ হাজার ৫০০ টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
নারী সদস্যদের প্রতিও সহিংসতা চালানো হয়। অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সাবেরা সুলতানাকে চুল ধরে টেনে ফেলা,
পোশাক টেনে শ্লীলতাহানি,
শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত,
গলা থেকে এক ভরি স্বর্ণের চেইন ছিনিয়ে নেওয়া।
প্রতিবেশীরা এগিয়ে এলে হামলাকারীরা স্থান ত্যাগ করে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সজল ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে বরিশালের কোতয়ালী ও এয়ারপোর্ট থানায় অন্তত চারটি গুরুতর মামলা রয়েছে।
দ্রুত বিচার আইনে মামলা (২০০৭),
মারধর, চুরি ও চাঁদাবাজি (২০১২),
মারধর, আটকে রাখা ও চুরি (২০১৬),
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন (২০১৭)।
পরিবারের দাবি, সজল ও উজ্জ্বল বহুবার সাক্ষীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে মামলা থেকে নিজেদের রক্ষা করেছেন।
পরিবার জানায়,২৩ নভেম্বরের ঘটনার এক বছর আগে সজলের সঙ্গে কথাকাটাকাটির জেরে বরিশাল জজকোর্টের আইনজীবী মিলন ভূঁইয়া জুতার আঘাত পান সজলের থেকে। লাঞ্ছনার কিছুক্ষণ পরই তিনি হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হন।
তিনি চার দিন বরিশালে হাসপাতালে ভর্তি থাকার পর অবস্থার অবনতি হলে ঢাকার হার্ট ফাউন্ডেশনে স্থানান্তর করা হয়। পরিবারের দাবি। সজলের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সংঘাত, চাপ ও ভয়ভীতিই মিলনের অসুস্থতার কারণ হয়ে ওঠে।
পরিবার মনে করে,এ ঘটনা দুই ভাইয়ের আচরণ ও প্রভাব বিস্তারের পূর্বাপর চিত্র তুলে ধরে।
পরিবারের এক নারী সদস্য সজলের বিধবা (খালা), ছদ্মনামে “ছালমা”, জানান,সজল তার ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ব্ল্যাকমেইল করেছেন। তার দাবি সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়, কয়েক দফায় প্রায় ১০ লাখ টাকা আদায় করা হয়, নিয়মিত হুমকিতে তিনি মানসিক চাপে ছিলেন এবং এখনও আতঙ্কে আছেন।
তিনি আরও জানান, সজলের সঙ্গে জড়িত আরেক নারী সদস্য এ ব্ল্যাকমেইল চক্রকে আরও শক্তিশালী করে।
ভুক্তভোগী পরিবার অভিযোগ করে আরো বলেন হামলার পরপরই সজল ভূঁইয়া কিছু সাংবাদিককে ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে নিজের পক্ষে সংবাদ প্রকাশ করান। উদ্দেশ্য একটাই নিজেদের নির্দোষ দেখানো,
ভুক্তভোগীদের চরিত্রহরণ, মামলাকে দুর্বল করা। প্রতিবেশীরা বলেন,ঘটনার পর কিছু গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর ছিল পক্ষপাতদুষ্ট।
সরজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, জমি, বাড়ি ও আর্থিক বিরোধ বহু বছর ধরে ভূঁইয়া পরিবারকে অস্থির করে রেখেছে। স্থানীয়দের দাবি,এলাকায় যেকোনো ঝামেলায় প্রায়ই সজল ও উজ্জ্বলের নাম উঠে আসে।
এক দোকানদার বলেন,“এ এলাকায় ঝামেলা হলে বেশিরভাগ সময় এই দুই ভাইয়ের নাম শোনা যায়।”
বরিশাল কোতয়ালী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তদন্ত জানান,
এজাহার গ্রহণ করা হয়েছে নাকি তা আমার জানা নেই, তবে ওসি ছুটিতে আছে, কোন ধরনের সমস্যা থাকলে থানায় শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। “এটি পারিবারিক বিরোধ হলেও ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুতর। তদন্তে কোনো পক্ষকে ছাড় দেওয়া হবে না।
এদিকে আইনজীবী মিলন ভূইয়া জানান, এ এযহার থানায় জমা দেওয়ার পর থেকে ওসি কোতোয়ালি করেনি আর কল রিসিভ। উল্টো বারবার লাঞ্চিত হতে হচ্ছে রাস্তাঘাটে আসামি পক্ষের কাছে।
এ ঘটনার পর পুরো ল’কলেজ কম্পাউন্ড এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের মতে
বহুদিনের অভ্যন্তরীণ উত্তেজনা এবার বিস্ফোরিত হয়েছে,
সহিংসতা এমন পর্যায়ে গেছে যে বাহ্যিক হস্তক্ষেপ জরুরি,
নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া পরিস্থিতি স্থিতিশীল হবে না।
ল’ কলেজ এলাকার বাসিন্দা আশিকুল ইসলাম মিরাজ বলেন,বাড়ির ভেতরের দ্বন্দ্ব যখন রাস্তায় বের হয়ে আসে, তখন তার পরিণতি ভয়ংকর হয়।”
ভূঁইয়া পরিবারের চলমান সংকট এখন আর শুধু পারিবারিক বিরোধ নয়; এটি বরিশালের এক দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার প্রতিচ্ছবি। বহু বছরের মামলা, হুমকি, ব্ল্যাকমেইল, নারী নির্যাতন ও ক্ষমতার প্রভাব,সব মিলিয়ে পরিবারটি ভেতর থেকে ক্ষয়ে যাচ্ছে।
এখন সবার দৃষ্টি, তদন্ত কতটা নিরপেক্ষ হয় এবং বিচারিক প্রক্রিয়া এসব অভিযোগকে কীভাবে মূল্যায়ন করে।
লিড নিউজ অনলাইন ডেস্ক, আইন-আদালত, বরিশাল, বরিশাল বিভাগ


