এম. জাহিদ।। বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. এ বি এম সোলায়মান মাসুমের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, নারী কর্মীদের যৌন হয়রানি, ঘুস বাণিজ্য এবং সাংবাদিকদের প্রতি চরম অবমাননাকর মন্তব্য করার এক বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে। অডিও রেকর্ডে তাকে সাংবাদিকদের ‘জারজ সন্তান’ এবং নারী কর্মীদের বেশ্যা ও সেকেন্ড হ্যান্ড মাল’ হিসেবে সম্বোধন করতে শোনা গেছে। শুধু তাই নয় নিজের অপরাধ ঢাকতে কর্মচারীদের জিম্মি করে বাধ্যতামূলক মানববন্ধন করানোর মতো নজিরবিহীন ঘটনাও ঘটিয়েছেন তিনি। এদিকে অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এই কর্মকর্তার অঢেল অবৈধ সম্পদের তথ্য।
অডিও রেকর্ডে অশালীনতার প্রমাণ ও লিগ্যাল নোটিশ। তথ্যমতে গত ১৬ মার্চ ২০২৬ তারিখে একটি দাপ্তরিক সভায় ডা. সোলায়মান মাসুম চরম অপেশাদার আচরণ করেন। তিনি মন্তব্য করেন যে, জার্নালিজমে ডিগ্রি ছাড়া অন্য সব সাংবাদিক ‘পিওর জারজ’ (Pure Bastard)। এছাড়া সভায় উপস্থিত নারী কর্মীদের উদ্দেশ্যে তিনি ‘লিপস্টিক ও পারফিউম মাখলে বেশ্যা এবং উম্মে হাবিবা ছন্দা নামের এক কর্মীকে সেকেন্ড হ্যান্ড মাল বলে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেন। এই ঘটনায় বরিশাল জজ কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোঃ মুশফিকুর রহমান রাফির মাধ্যমে তাকে লিগ্যাল নোটিশ প্রদান করা হয়েছে। নোটিশে তার বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪৯৯, ৫০০ (মানহানি) ৫০৯ (নারীর অমর্যাদা) এবং সাইবার নিরাপত্তা আইনে মামলার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। সরোজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, ডা. সোলায়মানের কুপ্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা উম্মে হাবিবা ছন্দার বেতন দীর্ঘ ছয় মাস বন্ধ রাখা হয়। এমনকি দুর্ঘটনায় তার গর্ভপাত ঘটার পরেও তাকে ছুটি না দিয়ে উল্টো বিভাগীয় মামলা ও শোকজ করা হয়েছে। ২০২৪ সালে রাফিয়া নাসরিনসহ একাধিক নারী কর্মীর সাথে তার কেলেঙ্কারির খবর স্থানীয় পর্যায়ে উঠে এলেও তৎকালীন প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা পঙ্কজ নাথের আশীর্বাদে তিনি পার পেয়ে যান বলে বিসস্ত সূত্র জানায়। উল্লেখ্য, ডা. সোলায়মান এতটাই নারীবিদ্বেষী যে, তার স্ত্রী উচ্চ শিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও তাকে কোনো চাকরি করতে দেননি।
অভিযোগ রয়েছে, এই দপ্তরে ঘুস ছাড়া কোনো কাজ হয় না। তার প্রধান সহযোগী হিসেবে কাজ করেন জনৈক হেমায়েত সাহেব। কোনো কর্মী পেনশন বা ছুটিতে গেলে তাকে বিপুল পরিমাণ টাকা দিতে বাধ্য করা হয়। টাকা না দিলে ফাইল আটকে দেওয়া বা দুর্গম এলাকায় বদলির হুমকি দেওয়া হয়। অন্যদিকে, অনুগত এফপিআইদের (FPI) তিনি হাতে রাখেন, যার ফলে তারা নিজ নিজ ইউনিয়নে না থেকে মেহেন্দিগঞ্জ সদরে আড্ডা দিয়ে সময় কাটান।
সম্প্রতি ডা. সোলায়মানের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠিত হলে তিনি কর্মীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। চাকরি বাঁচানোর তাগিদে কর্মীরা মানববন্ধনে দাঁড়াতে বাধ্য হন, যেখানে ব্যানারে লেখা ছিল,
[উম্মে হাবিবা ছন্দা মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে
মেহেন্দীগঞ্জের পরিবার পরিকল্পনায় কর্মরত ডা. এবি সোলায়মান মাসুম এর বিরুদে অনলাইন এবং স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় মিথ্যা, হয়রানিমূলক ও কুরুচিপূর্ণ সংবাদদের প্রতিবাদ। তীব্র প্রতিবাদ এ
মানব বন্ধন আয়োজনে মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের কর্মচারীবৃন্দ]
মানববন্ধনের একাধিক কর্মীরা বলেন,আমরা নিরুপায়। স্যারের বিরুদ্ধে যেতে পারবো না।যারা ছুটিতে ছিলেন, তাদের বাড়িতে পিয়ন পাঠিয়ে জোরপূর্বক স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। এদিকে, তদন্ত কমিটির প্রধান ডা. সুরেন্দ্রনাথ সাহার বিরুদ্ধেও উঠেছে দুর্নীতির অভিযোগ। ভুক্তভোগীদের দাবি, তদন্ত গোপনে করার কথা থাকলেও তা অভিযুক্ত সোলায়মানের সামনেই করা হয়েছে, যাতে কেউ মুখ খুলতে সাহস না পায়। অভিযোগ উঠেছে, তদন্ত কমিটি ওই কর্মকর্তার ‘অবৈধ অর্থের’ কাছে নতি স্বীকার করতে পারে।
এদিকে কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে মিললো সাপের সন্ধান! অঢেল সম্পদের পাহাড়। অনুসন্ধানে ডা. সোলায়মান ও তার পরিবারের বিপুল সম্পদের খোঁজ মিলেছে। তার পিতা অবসরপ্রাপ্ত কাস্টমসের অফিস সুপার ছালাউদ্দিন বেপারী ছিলেন পঙ্কজ নাথের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। পঙ্কজ নাথের প্রভাব খাটিয়ে তারা মেহেন্দিগঞ্জের সদর ইউনিয়নের মেম্বার পদসহ বিভিন্ন সুবিধা ভোগ করেছেন। ডা. সোলায়মানের মালিকানাধীন সম্পদের মধ্যে রয়েছে:
ঢাকা উত্তরায় ফ্লাট ও ফরিদপুরের ওয়ারলেস পাড়ায় বহুতল ভবন। বরিশালের কাশীপুরে বিঘায় বিঘায় জমি, মেহেন্দিগঞ্জের বদুরপুরে আলিশান বিলাশ বহুল বাড়ী। ইউনিএইড হাসপাতালের মালিক।
সরকারি সাধারণ বেতনে একজন কর্মকর্তার পক্ষে এমন রাজকীয় জীবন ও অঢেল সম্পদ গড়ে তোলা কীভাবে সম্ভব, তা নিয়ে সচেতন মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
এসব বিষয়ে অভিযুক্ত ডা. সোলায়মান মাসুমের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কৌশলে এড়িয়ে যান। তবে জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মাহবুব মোর্শেদ জানান, অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং প্রতিবেদকে নিয়ে সত্য মিথ্যা যাচাই করবে।
বরিশাল এবং মেহেন্দিগঞ্জের সাংবাদিক সমাজ ও ভুক্তভোগী নারী কর্মীরা অবিলম্বে এই বিতর্কিত কর্মকর্তার অপসারণ এবং উচ্চপর্যায়ের জুডিশিয়াল তদন্তের মাধ্যমে তার অবৈধ সম্পদ ও অপকর্মের বিচার দাবি করেছেন।
ভরা মিটিংয়ে ডা. সোলায়মান মাসুম প্রায়ই দম্ভোক্তি করেন,আমিই তো ডিডি ডাইরেক্টর (DD Director), আমার কেউ কিছু করতে পারবে না। এই দম্ভের উৎস তার দীর্ঘ ৮ বছরের প্রভাব এবং রাজনৈতিক খুঁটি। তবে সাংবাদিক সমাজ ও সুশীল সমাজ বলছে “টাকার কাছে সবাই বিক্রি হয় না সত্যের জয় সু- নিশ্চিত।
ডা. সোলায়মান মাসুম এর পিতা ছালাউদিদিন মাসে ২৫ -২৬ হাজার টাকা বেতনে চাকরী করে সোলায়মানকে পড়াশোনা করায় আফতাবনগরের ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে যেখানে ভর্তি থেকে শুরু করে ৪ বছরের স্নাতক (Honours) শেষ করতেই খরচ আনুমানিক ১৫ -২০ লক্ষ টাকা। এবং ছোট ছেলেকেও পড়াশোনা করিয়েছেন প্রাইভেট ইন্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে। মূল বেতনের সাথে বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ভাতা এবং যাতায়াত ভাতা যুক্ত হয়ে একজন কর্মরত অফিস সুপারের এতটা রাজার মতো কি আদৌ এত বিলাস বহন ভাবে সন্তানদের পড়াশুনা করানো চালিয়ে যাওয়া সম্ভব?
ফর্মাল নিউজ -এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন চলমান…থাকছে আগামী পর্বে…
লিড নিউজ হোম


