এম. জাহিদ ::: মেহেন্দিগঞ্জে চলছে -এ যেন এক মগের মুল্লুক-লম্পট চিকিৎসককে বাঁচাতে প্রশাসনই যখন রক্ষক!
বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ এখন এক অন্ধকার জনপদ, যেখানে ন্যায়বিচার গুমরে কাঁদছে আর অপরাধীরা প্রশাসনের কাঁধে চড়ে অট্টহাসি হাসছে। এই দপ্তরের বিতর্কিত মেডিকেল অফিসার ডা. এ বি এম সোলায়মান মাসুমের বিরুদ্ধে ওঠা যৌন হয়রানি ও দুর্নীতির পাহাড়সম অভিযোগ ধামাচাপা দিতে খোদ প্রশাসনই এখন ‘রক্ষক’ হিসেবে মাঠে নেমেছে।
ভুক্তভোগী পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা উম্মে হাবিবা ছন্দাকে মিথ্যা অভিযোগে দণ্ড প্রদান এবং ডা. সোলায়মানের চরম কুরুচিপূর্ণ অডিও ফাঁসের পর গোটা বরিশালজুড়ে বইছে ক্ষোভের আগুন। ডা. সোলায়মানের নগ্ন দম্ভ ফাঁস হওয়া অডিও রেকর্ডে ডা. সোলায়মানকে অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ ভাষায় সাংবাদিকদের গালিগালাজ করতে শোনা যায়। তিনি সাংবাদিক সমাজকে উদ্দেশ্য করে বলেন, সাংবাদিকরা সব জারজ (Bastard) এখানেই শেষ নয়, দপ্তরে কর্মরত নারী সহকর্মীদের ব্যক্তিগত জীবন ও চরিত্র নিয়ে অত্যন্ত নোংরা মন্তব্য করে তিনি তাদের“সেকেন্ড হ্যান্ড মাল”হিসেবে আখ্যায়িত করেন। অডিওতে তার দম্ভোক্তি ছিল এমন আমার কিছুই হবে না, বাবার ক্ষমতা আর টাকা দিয়ে সব কিনে নেব। একজন সরকারি কর্মকর্তার মুখে এমন অসভ্য ও কুরুচিপূর্ণ ভাষা প্রশাসনের নৈতিক পতনকেই স্পষ্ট করে।
তদন্ত কমিটির প্রধান এডি সি.সি, ডা. শামসুজ্জামান নিরপেক্ষ তদন্তের পরিবর্তে ডা. সোলায়মানের সাথে গোপনে বৈঠক করেছেন। তদন্ত চলাকালীন ডা. সোলায়মানকে ক্লিনচিট দেওয়ার নীল নকশা তৈরি করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৩ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বরিশাল বিভাগীয় পরিচালক মোহাম্মদ আবুল কালাম স্বাক্ষরিত এক আদেশে (স্মারক নং: ১৮৮) ভুক্তভোগী ছন্দাকে শাস্তিমূলক বদলি করা হয় পটুয়াখালীতে। অথচ যে মূল অপরাধী, সেই ডা. সোলায়মান মাসুম বহাল তবিয়তে মেহেন্দিগঞ্জেই অবস্থান করছেন।
এদিকে ডিডির উদ্ধত্য ও প্রশাসনিক দেউলিয়াত্ব
জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক (ডিডি) মেহেবুব মোর্শেদ এই অন্যায়ের ঢাল হিসেবে কাজ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগীর ইনক্রিমেন্ট স্থগিত এবং এই অন্যায় বদলির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সদুত্তর দিতে পারেননি। হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় তিনি অত্যন্ত ঔদ্ধত্যের সাথে বলেন, (উনি আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারেন। আদেশের কারণ আদেশে লেখা আছে। এটাই আমার ব্যাখ্যা) এখন প্রশ্ন হচ্ছে দায়িত্বশীল পদের একজন কর্মকর্তার এমন অপেশাদার আচরণ প্রমাণ করে যে, তিনি অভিযুক্তের স্বার্থ রক্ষায় কতটা মরিয়া।
প্রতিবেদকের সরোজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, ডা. সোলায়মানের বাবা এনবিআরের সাবেক কর্মকর্তা হওয়ার সুবাদে তিনি বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থের মালিক। ঢাকার উওরায় , ফরিদপুরের ওয়ারলেসপাড়া ও বরিশালের কাশিপুর এবং মেহেন্দিগঞ্জে তার নামে গড়ে ওঠা বহুতল অট্টালিকার উৎস নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে আগে থেকেই।মেহেন্দীগঞ্জের ফ্যাসিস্ট সরকার আওয়ামীলীগ এর সাবেক এমপি পঙ্কজ দেবনাথের আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ায় তিনি নিজেকে ‘ছায়া ডিডি’ পরিচয় দিয়ে গোটা দপ্তরকে জিম্মি করে রেখেছেন। তদন্ত কমিটির সামনে তিনি অর্থের বিনিময়ে কিছু ভাড়াটে ‘ভুঁইফোড়’ লোককে সাংবাদিক সাজিয়ে হাজির করেছিলেন, যা তদন্ত প্রক্রিয়াকে আরও কলঙ্কিত করেছে।
অডিও রেকর্ডের কথোপকথন তদন্ত কমিটির প্রধান ডাক্তার সিরাজ আহম্মেদ এর সাথে মোবাইলে কথোপকথনের কিছু প্রশ্ন তুলে ধরা হলো।
*সংবাদকমী-আচ্ছা স্যার, ডা. সোলায়মানের যে অডিও রেকর্ডগুলো ফাঁস হয়েছে, যেখানে তিনি সাংবাদিকদের ‘জারজ’ এবং নারী সহকর্মীদের ‘সেকেন্ড হ্যান্ড মাল’ বলছেন এসব কি তদন্তে উঠে এসেছে? আপনারা কি এগুলো আমলে নিয়েছেন?
তদন্ত কর্মকর্তা সিরাজ =দেখুন, আমরা তদন্ত করছি। বিষয়গুলো আমাদের নলেজে আছে। তবে সবকিছু তো আর হুট করে বলা যায় না। তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিলে আপনারা বিস্তারিত জানতে পারবেন।
*সংবাদকর্মী= কিন্তু স্যার, অভিযোগ আছে যে আপনারা তদন্ত চলাকালীন ডা. সোলায়মানের সাথে গোপনে বৈঠক করেছেন। এমনকি তিনি সাংবাদিকদের যেখানে গালি দিচ্ছেন, সেখানে আপনারা তদন্ত করতে গিয়ে সাংবাদিকদের সাথে কথা না বলে তার পছন্দের কিছু লোককে সাংবাদিক সাজিয়ে কথা বলেছেন। এটা কি পক্ষপাতিত্ব নয়?
তদন্ত কর্মকর্তা সিরাজ = (কিছুটা এড়িয়ে যাওয়ার ভঙ্গিতে) না না, পক্ষপাতিত্বের কিছু নেই। আমরা নিয়মতান্ত্রিকভাবেই কাজ করছি। আর কে সাংবাদিক আর কে না, সেটা যাচাই করার দায়িত্ব তো আমাদের না। যারা সামনে এসেছে, তাদের কথা শুনেছি।
সংবাদকর্মী= ভুক্তভোগী উম্মে হাবিবা ছন্দাকে তো ইতিমধ্যে বদলি করা হয়েছে এবং তার ইনক্রিমেন্ট বন্ধ করা হয়েছে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই কেন তাকে দণ্ড দেওয়া হলো? এটা কি ডা. সোলায়মানকে সুবিধা করে দেওয়া নয়?
তদন্ত কর্মকর্তা সিরাজ = সেটা জেলা কার্যালয় বা ডিডি সাহেব ভালো বলতে পারবেন। বদলির আদেশ আমাদের হাত থেকে হয়নি, ওটা বিভাগীয় পর্যায় থেকে হয়েছে। আমরা শুধু অভিযোগের তদন্ত করছি।
সংবাদকর্মী= সোলায়মান তো নিজেকে ‘ছায়া ডিডি’ দাবি করেন এবং বলেন তার বাবার অনেক টাকা ও ক্ষমতা আছে, তাই কেউ তার কিছু করতে পারবে না। এই দম্ভোক্তির পরেও কি প্রশাসন তার বিরুদ্ধ ব্যবস্থা নিতে ভয় পাচ্ছে?
তদন্ত কর্মকর্তা সিরাজ = প্রশাসন কাউকে ভয় পায় না। তবে সবকিছুর জন্য প্রমাণের প্রয়োজন হয়। আমাদের কাজ রিপোর্ট জমা দেওয়া, সিদ্ধান্ত নেবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। আপনারা ডিডি সাহেবের সাথে কথা বলুন, উনি বিস্তারিত বলতে পারবেন।
সংবাদকর্মী= ডিডি সাহেব তো বলছেন ‘আদেশ আদেশে লেখা আছে’। আপনারা তদন্ত কমিটিও যদি পরিষ্কার করে কিছু না বলেন, তবে ভুক্তভোগী নারী বিচার পাবেন কোথায়?
তদন্ত কর্মকর্তা সিরাজ = (বিরক্তি সহকারে) আমি এখন এ বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে পারছি না। আমরা আমাদের কাজ করছি। সময় হলে সব জানতে পারবেন।
এখখ কথোপকথনের মূল সারমর্ম অডিওতে স্পষ্ট যে, তদন্ত কর্মকর্তা সাংবাদিকদের প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর না দিয়ে বারবার এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। বিশেষ করে ডা. সোলায়মানের কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য এবং ভুক্তভোগীর ওপর শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিষয়ে প্রশাসনের দায়সারা মনোভাব ফুটে উঠেছে।
এ বিষয়ে তদন্ত কমিটির সদস্য সচিব পটুয়াখালীতে কর্মরত এডিসিসি ডা. শামসুজ্জামানকে একাধিকবার কল দিলেও তিনি তার রিসিভ করেননি
সচেতন মহল ও স্থানীয় সংবাদকর্মীরা এই ‘সাজানো’ তদন্ত প্রত্যাখ্যান করে অবিলম্বে একটি উচ্চপর্যায়ের জুডিশিয়াল তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে,দ্রুত সময়ের মধ্যে ডা. সোলায়মান মাসুমের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং ভুক্তভোগীর ওপর থেকে অন্যায় দণ্ড প্রত্যাহার করা না হলে বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয় বিতর্ক ও বানিজ্যিক কেন্দ্রবিন্দু সেটা বুঝতে আর কারো বাকি থাকবে না।
প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে একজন লম্পট ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা গোটা নারী সমাজ এবং সাংবাদিক সমাজকে অপমান করার দুঃসাহস কোথায় পায়? প্রতিবেদক এম.জাহিদ এই অপশক্তির মুখোশ উন্মোচনে বদ্ধপরিকর। ডা. সোলায়মানের প্রতিটি অপকর্মের নথিপত্র এবং আরও চাঞ্চল্যকর অডিও রেকর্ড পর্যায়ক্রমে প্রকাশ করা হবে খুব শ্রীগই।
[অনুসন্ধান চলমান… পরবর্তী পর্বে থাকছে ডা. সোলায়মান মাসুমের অবৈধ ক্লিনিক বাণিজ্য ও নিয়োগ সিন্ডিকেটের কোটি টাকার ডিজিটাল ডিভাইস দুর্নীতি গোপন তথ্য]
লিড নিউজ গণমাধ্যম, জাতীয়, তথ্যপ্রযুক্তি, বরিশাল, বরিশাল বিভাগ, শিরোনাম, সারাদেশ, স্বাস্থ্য, হোম


