এম.জাহিদ।।
পৃথিবীর আলো দেখার আগেই নিয়তির নির্মম নিষ্ঠুরতায় বা নরপশুদের চরম অবহেলায় নিভে গেল একের পর এক তাজা প্রাণ। চিকিৎসাকেন্দ্র যেখানে মানুষের শেষ ভরসাস্থল, বেঁচে থাকার একমাত্র ঠিকানা হওয়ার কথা বিশ্বের বৃহত্তম তৃতীয় হসপিটাল হিসেবে পরিচিত দক্ষিণাঞ্চলের সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (শেবাচিম) আজ সেই পবিত্র স্থানটিকেই যেন পরিণত করেছে এক বিভীষিকাময় মৃত্যুর উপত্যকায়। মাত্র ৭২ ঘণ্টার ব্যবধানে এই হাসপাতালের নবজাতক ওয়ার্ডে (নিউনেটাল ইউনিট) ঝরে গেছে ২১টি অবুঝ শিশুর প্রাণ।সরজমিনে গিয়ে চলতি মাস অর্থাৎ ১-২ও ৩ তারিখ দেখা মিলে এমন ঘটনার।
একটি বা দুটি নয়, একুশটি তরতাজা প্রাণ ঝরে যাওয়ার এই মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক ঘটনায় পুরো হাসপাতাল চত্বরজুড়ে এখন শোকের মাতম। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে মা-ববাবের বুকফাটা আর্তনাদ আর কান্নার রোল। কিন্তু এই আকাশছোঁয়া কান্না, স্বজনদের বুকচাপা আর্তনাদ কিংবা অবুঝ শিশুদের ছটফটানিও গলা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি কতিপয় অসাধু চিকিৎসক ও তাদের গড়া অমানবিক সিন্ডিকেটের বধির হৃদয়ে। উল্টো অভিযোগ উঠেছে, এই মৃত্যুর মিছিলে শোকের ছায়া তো দূরের কথা, একশ্রেণির চিকিৎসক মজেছেন চরম উদাসীনতা ও উৎসবের আনন্দে!
সরোজমিনে প্রতিবেদক এর উপস্থিতিতেই বুকভাঙ্গা কান্না নিয়ে ঘুরে বেড়ানো অসহায় ও দরিদ্র পরিবারগুলোর অভিযোগের তীর সরাসরি হাসপাতালের নির্দিষ্ট কিছু প্রভাবশালী জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকের দিকে। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের আর্তনাদ,শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. বিকাশ চন্দ্র নাগ কিংবা ডা. স্বপন কুমার হালদারদের মতো জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকদের নাগাল পাওয়া যেন সাক্ষাৎ ‘সোনার হরিণ’ পাওয়ার সমান।
কাগজ-কলমে বা হাসপাতালের ডিউটি রোস্টারে তাদের নাম ও ডিউটি থাকলেও বাস্তবে ওয়ার্ডে তাদের ছায়াও মাড়ায় না। মুমূর্ষু নবজাতকরা যখন হাসপাতালের বিছানায় ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে, তখন এই চিকিৎসকদের দেখা মেলে না। জীবন-মৃত্যুর এই সন্ধিক্ষণে জুনিয়র চিকিৎসক বা আনাড়ি ইন্টার্নদের ওপর পুরো ওয়ার্ডের সব দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে তারা নিজেদের পকেট ভারী করতে ব্যস্ত থাকেন প্রাইভেট প্র্যাকটিস ও ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধারে। মানুষের জীবন নিয়ে এমন ছিনিমিনি খেলার নজির ইতিহাসে বিরল।
৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে যখন একের পর এক মা তার বুক খালি করছেন, তখন অভিযুক্ত চিকিৎসকদের চোখে-মুখে ন্যূনতম অনুশোচনা বা দায়িত্ববোধের লেশমাত্রও ছিল না। চিকিৎসকদের এই নির্দয় উদাসীনতা দেখে ক্ষুব্ধ জনতা ও স্বজনরা প্রশ্ন তুলেছেনবএটি কি কেবলই চিকিৎসা ত্রুটি, নাকি সুপরিকল্পিত কোনো অবহেলা? রোগীর জীবনের প্রতি এমন নির্মম আচরণ ও নির্বিকার ভাব দেখে কোনো কোনো শোকার্ত স্বজন একে ‘মৃত্যুর উৎসব’ বলে অভিহিত করেছেন।
শিশু বিভাগের অন্যতম বিতর্কিত মুখ ও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেজিস্ট্রার (এআর) ডা. হামিম সুলতানা। বিভাগীয় প্রধান ডা. বিকাশ চন্দ্র নাগের প্রত্যক্ষ ছত্রছায়ায় থাকা এই চিকিৎসক তার রগচটা স্বভাব ও দুর্ব্যবহারের জন্য হাসপাতালে এক ত্রাসের নাম। অতীতে চিকিৎসার নামে অবহেলার প্রতিবাদ করায় এক রোগীর স্বজনকে থাপ্পড় মারার মতো জঘন্য ঘটনাও ঘটিয়েছেন তিনি। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ও সরকার পতনের পরপরই রোগীর স্বজনদের রোষানলে পড়ে তার বেপরোয়া আচরণের উপযুক্ত জবাব বা উত্তম-মাধ্যমের শিকার হতে হয়েছিল তাকে।
হাসপাতালের একাধিক কর্মকর্তা ও স্বাস্থ্যকর্মী জানান, এই বিতর্কিত চিকিৎসকদের খামখেয়ালিপনা আর সাধারণ মানুষের ওপর চালানো নির্যাতনের কারণে পুরো শেবাচিম হাসপাতালে চিকিৎসক সমাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখন আলাদাভাবে আনসার ভিডিপির সদস্যদের পাহারায় রাখতে হয় এবং নিয়মিত বেতন গুনতে হয়।
এছাড়া এই পুরো সিন্ডিকেটের নেপথ্যে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে চিকিৎসকদের সংগঠন ‘ড্যাব’-এর প্রভাবশালী সদস্য সহকারী অধ্যাপক ডা. ফয়সাল হাসান ভূইয়া পর্দার আড়াল থেকে মদদ জুগিয়ে যাচ্ছেন বলেও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
শেবাচিমের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি হাসপাতালে এমন মর্মান্তিক ঘটনা নতুন কিছু নয়। অতীতেও অসংখ্যবার চিকিৎসকদের খামখেয়ালিপনা, দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য এবং সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলেও অদৃশ্য শক্তির ইশারায় কড়া কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। যার ফলে এই অসাধু চক্র দিন দিন আরও বেশি বেপরোয়া ও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। অসহায় মানুষগুলোর কান্নার আওয়াজ যেন চার দেয়াল ভেদ করে হাসপাতালের এসি রুমে থাকা দুর্নীতিবাজ কর্তাব্যক্তিদের কানে পৌঁছায় না।
নিষ্পাপ নবজাতকদের এই রহস্যজনক ও মর্মান্তিক মৃত্যুর পেছনে কার কী দায় রয়েছে, কার অবহেলায় একেকটি তাজা প্রাণ ঝরে গেল তা নিরপেক্ষভাবে উদঘাটনে অবিলম্বে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিক সমাজ ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। একই সঙ্গে অভিযুক্ত চিকিৎসক বিকাশ চন্দ্র নাগ, স্বপন কুমার হালদার ও হামিম সুলতানাসহ এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়েছে।
চিকিৎসা পেশার মতো একটি পবিত্র ও মহান পেশাকে যারা কলঙ্কিত করছে, দক্ষিণাঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের শেষ ভরসাস্থল এই হাসপাতালে যারা মৃত্যুরোপত্যকা তৈরি করেছে তাদের বিরুদ্ধে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সরকারের উচ্চপর্যায়ের কঠোর হস্তক্ষেপ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। আর কত তাজা প্রাণ ঝরলে টনক নড়বে এই প্রশাসন ও চিকিৎসকদের?
লিড নিউজ জাতীয়, নারী ও শিশু, বরিশাল, বরিশাল বিভাগ, শিরোনাম, সারাদেশ, স্বাস্থ্য, হোম




