বিশেষ প্রতিবেদন: বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে (শেবাচিমহা) বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন বিতর্কিত ও মাদকাসক্ত রোগীর দালাল দেলোয়ার। জালিয়াতি, হুমকি, অবৈধ দখলদারি ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে তিনি বর্তমানে পুরো হাসপাতাল চত্বরে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন। তার নানামুখী অপকর্ম ও দৌরাত্ম্যে হাসপাতালের সার্বিক চিকিৎসা পরিবেশ চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং ঐতিহ্যবাহী এই সরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের সুনাম মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন ও চতুরতার আশ্রয় নিতে দেলোয়ার অত্যন্ত পটু। বর্তমান প্রেক্ষাপটে নিজেকে বিএনপি নেতা হিসেবে পরিচয় দিলেও বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যক্তিগত স্বার্থ ও সুবিধা হাসিলের উদ্দেশ্যে তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন। সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে রূপ পাল্টে তিনি এখন হাসপাতালের আউটসোর্সিং কর্মচারীদের স্বঘোষিত নেতা বনে গেছেন। সাধারণ কর্মচারীদের বকেয়া বেতন ও নানা দাবি আদায়ের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে ঢাকা যাওয়ার যাতায়াত খরচ বাবদ তিনি নিয়মিত মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায় করছেন। দেলোয়ারের কাছে কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েছেন সাধারণ আউটসোর্সিং কর্মীরা। তার ভয় ও মানসিক নির্যাতনের কারণে কেউ মুখ ফুটে প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছেন না।
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে, দেলোয়ার দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর মাদকাসক্ত। তার এই বেপরোয়া জীবনযাপন ও মাদকাসক্তি দূর করতে পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে ইতিপূর্বে দুই দুইবার মাদক নিরাময় কেন্দ্রে (রিহ্যাব) পাঠানো হয়েছিল। তবে রিহ্যাব থেকে ফেরার পরও তার আচরণ ও অপকর্মের কোনো পরিবর্তন হয়নি; বরং হাসপাতাল কেন্দ্রিক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে তিনি আরও বেশি আগ্রাসী হয়ে উঠেছেন। পূর্বে হাসপাতাল কম্পাউন্ডে একটি অ্যাম্বুলেন্স আটকে ২ লক্ষ টাকা চাঁদা দাবি করেন দেলোয়ার। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তিনি অ্যাম্বুলেন্সের চালক ও সহযোগীদের ওপর অতর্কিত হামলা চালান এবং মারধর করেন।
হাসপাতালের ৫ম তলার ডক্টরস ক্যান্টিনটি অবৈধভাবে জোরপূর্বক নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য দৌড় ঝাপ কম করেনি, ব্যার্থ হয়ে বছরের পর বছর ধরে এটি সুনামের সাথে পরিচালনা করে আসা মজেদ ও তার ছেলে আরিফুর রহমানকে চরম গালিগালাজ ও প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে চলে যায় দেলোয়ার। আওয়ামী লীগ নেতা তাজুলের প্রধান ছায়াসঙ্গী ও প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছেন দেলোয়ার। তাজুল নিজে আড়ালে থেকে দেলোয়ারকে ব্যবহার করে নিজের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন। এছাড়া মেডিকেলের সামনে অবস্থিত বিতর্কিত ‘আবাসিক হোটেল বিসমিল্লাহ’ কেন্দ্রিক অসামাজিক ও অবৈধ কর্মকাণ্ড পরিচালনাতেও দেলোয়ারের সরাসরি ইন্ধন রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
কাগজে-কলমে আউটসোর্সিং কর্মচারী হলেও দেলোয়ার হাসপাতালে নির্ধারিত কোনো ডিউটি বা দায়িত্ব পালন করেন না। তার সারাদিনের কাজ হাসপাতালে আসা বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের কাছ থেকে ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা তোলা, বদলি ও তদবির বাণিজ্য করা। উল্লেখ্য, বহুগুণে চিহ্নিত এই দালাল ইতিপূর্বে প্রশাসনের হাতে হাতেনাতে গ্রেপ্তার হয়ে সাজা ভোগ করেছিলেন।
হাসপাতালের এমন বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি ও দেলোয়ারের একের পর এক অপকর্মের কথা সর্বজনবিদিত হলেও রহস্যজনক কারণে নিশ্চুপ রয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। বর্তমান হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মশিউর মুনির সবকিছু জেনেও তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো আইনি বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন না। পরিচালকের এই রহস্যজনক নীরবতায় সাধারণ কর্মচারী, ভুক্তভোগী রোগী ও চিকিৎসকদের মনে চরম ক্ষোভ ও ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে।
বরিশালের সচেতন মহল, ভুক্তভোগী সাধারণ আউটসোর্সিং কর্মচারী, ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি এবং অ্যাম্বুলেন্স চালক সমিতি অবিলম্বে এই চিহ্নিত দালাল ও চাঁদাবাজের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন। তারা আশা করছেন, শেবাচিমহার সুযোগ্য পরিচালক ডাঃ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মশিউর মুনির দ্রুত সময়ের মধ্যে দেলোয়ারের আনীত সকল অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করবেন, তাকে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেবেন এবং হাসপাতালের সার্বিক সুনাম ও নিরাপত্তা রক্ষা করবেন।



