এম.জাহিদ, বরিশাল::
আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে মামলা গ্রহণে বিলম্ব এবং থানায় আসা ভুক্তভোগী এক নারী বাদীকে উদ্দেশ করে আপনি সেই মাল? ইবলিস যেন কোথাকার,এমন চরম আপত্তিকর ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করার অভিযোগে বরগুনার পাথরঘাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ এনামুল হককে অবশেষে প্রত্যাহার (ক্লোজ) করা হয়েছে।
বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ের এক জরুরি আদেশে তাকে পাথরঘাটা থানা থেকে সরিয়ে বরগুনা জেলা পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়। একই সাথে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর অভিযোগের সত্যতা অনুসন্ধানে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
আদালত ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২০ মে বরগুনার অ্যাসিড অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল ভুক্তভোগী নারী ফাতিমা জোমাদ্দার অর্পার একটি অভিযোগ নিয়মিত মামলা (এফআইআর) হিসেবে রেকর্ড করার জন্য পাথরঘাটা থানার ওসিকে নির্দেশ দেন। কিন্তু আদালতের স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও মামলাটি নথিভুক্ত করতে চরম গড়িমসি করেন ওসি এনামুল হক।
পরবর্তীতে ভুক্তভোগী ওই নারী মামলার বিষয়ে থানায় গেলে ওসির চরম অসদাচরণের শিকার হন। ওসির মুখ থেকে বের হওয়া এই আপত্তিকর মন্তব্যটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
ঘটনার সময় থানায় উপস্থিত থাকা পাথরঘাটা উপজেলা পরিষদের সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেত্রী মরিয়ম চৌধুরী জেবু ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে
আমার উপস্থিতিতেই ওসি মামলার বাদী অর্পাকে উদ্দেশ করে ‘আপনি সেই মাল?’ বলে মন্তব্য করেন। একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তার মুখে এমন অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ কথা শুনে উপস্থিত সবাই চরম বিব্রত হয়েছিল। আদালতের নির্দেশ সময়মতো বাস্তবায়ন করলে হয়তো পরবর্তী অপ্রীতিকর ঘটনা এড়ানো যেত।
ভুক্তভোগী অর্পার অভিযোগ, মামলার প্রধান আসামি বাদশা আকনকে গত বুধবার রাতে পুলিশ আটক করলেও রহস্যজনক কারণে ছেড়ে দেয়।
এর পরপরই বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) দুপুর ১২টার দিকে উপজেলার চরদুয়ানী এলাকা থেকে থানায় আসার পথে আসামিপক্ষ অর্পার ওপর অতর্কিত হামলা চালায়, তাকে মারধর করে এবং একটি ঘরে অবরুদ্ধ করে রাখে। পরে পুলিশ গিয়ে তাকে উদ্ধার করে। বরগুনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (পাথরঘাটা সার্কেল) মোহাম্মদ শাহেদ চৌধুরী হামলার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, খবর পাওয়া মাত্রই পুলিশ পাঠিয়ে বাদীকে উদ্ধার করা হয়েছে।
এই বিতর্কিত ঘটনা এবং ওসির ব্যক্তিগত নম্বরে নারী বাদীকে হেনস্থা করার অডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি মো. মোস্তাফিজুর রহমান তাৎক্ষণিক কঠোর পদক্ষেপ নেন। তিনি ওসি এনামুল হককে ক্লোজ করার নির্দেশ দেন এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দায়িত্ব দেন পাথরঘাটা সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শাহেদ চৌধুরীকে।
এ বিষয়ে ফর্মাল নিউজের সাথে আলাপকালে বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজি মো. মোস্তাফিজুর রহমান অত্যন্ত কঠোর ও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, পাথরঘাটা থানার ওসির অপকর্মের দায় বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনী নেবে না। তিনি যদি কোনো অপরাধ বা অপেশাদার আচরণ করে থাকেন, তবে তার দায় সম্পূর্ণ তার ব্যক্তিগত। তদন্তে সত্যতা প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য যা যা করা প্রয়োজন, সব করা হবে।
একই সাথে ওসির এই অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে যেসকল গণমাধ্যমকর্মী ও সাংবাদিক সাহসিকতার সাথে সত্য ঘটনা তুলে ধরেছেন, তাদের প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন ডিআইজি।
বরিশাল রেঞ্জে যোগদানের পর থেকেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং পুলিশ বাহিনীকে দুর্নীতি ও অনিয়মমুক্ত করার ক্ষেত্রে ডিআইজি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের ভূমিকা সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে। পাথরঘাটার বিতর্কিত ওসির বিরুদ্ধে তার এই দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক অ্যাকশনের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বরগুনা ও বরিশালের সাধারণ মানুষের মাঝে স্বস্তি ও সন্তোষ প্রকাশ পেয়েছে। ভুক্তভোগী মহল আশা করছে, তদন্ত কমিটির নিরপেক্ষ রিপোর্টের ভিত্তিতে এই বিতর্কিত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক চূড়ান্ত বিভাগীয় শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
লিড নিউজ অনলাইন ডেস্ক, বরগুনা, বরিশাল বিভাগ, শিরোনাম, সারাদেশ, হোম


