এম জাহিদ, বরিশাল: বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের (বিএমপি) ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত, সাহসী ও দূরদর্শী কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) মো. ছগির হোসেন র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নে (র্যাব) বদলি হয়েছেন। নির্ভরযোগ্য উচ্চপদস্থ সূত্র এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। মাঠপর্যায়ে অপরাধ দমন, মাদক নির্মূল, অস্ত্র উদ্ধার এবং সাহসিকতার সাথে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তাঁর অনন্য অবদান সর্বজনস্বীকৃত। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই চৌকস ও আপসহীন কর্মকর্তার বিএমপি ছেড়ে চলে যাওয়াকে মাঠপর্যায়ের পুলিশিংয়ে একটি বড় শূন্যতা ও অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট মহল ও স্থানীয় সচেতন নগরবাসী।
র্যাবে বদলির প্রাক্কালেও বরিশাল নগরীতে মাদকের বিরুদ্ধে নিজের ঘোষিত ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির প্রামাণ্য স্বাক্ষর রেখে গেছেন ইন্সপেক্টর ছগির হোসেন। সোমবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বে ডিবি পুলিশের একটি চৌকস দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে নগরীর হাতেম আলী চৌমাথা এলাকায় এক সাঁড়াশি অভিযান চালায়।
অভিযানের সময় পুলিশকে ফাঁকি দিতে মোটরসাইকেলের তেলের ট্যাংকের ভেতরে সেভেনআপের তিনটি ছোট বোতলে অভিনব পদ্ধতিতে লুকিয়ে পাচারকালে ৬ হাজার পিস ইয়াবাসহ মাহাবুব শেখ (৪২) নামের এক আন্তঃজেলা মাদক কারবারিকে হাতেনাতে আটক করা হয়। আটককৃত মাহাবুব সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার ভুরুলিয়া ইউনিয়নের মাজাট গ্রামের মৃত আহাদউল্লাহ শেখের ছেলে। এ ঘটনায় ডিবি পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) ফিরোজ আলম বাদী হয়ে কোতোয়ালি মডেল থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা দায়ের করেছেন।
সফল অভিযান প্রসঙ্গে ইন্সপেক্টর ছগির হোসেন জানান, “মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান সবসময়ই কঠোর ও আপসহীন। অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকতে যতই নিত্যনতুন ও অভিনব কৌশল অবলম্বন করুক না কেন, গোয়েন্দা নজরদারি এড়িয়ে কাউকেই পার পেতে দেওয়া হবে না।”
, সাম্প্রতিক সময়ে বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানার হেফাজত থেকে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের এক শীর্ষ নেতা পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় যখন পুরো পুলিশ প্রশাসন এক বড় ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতি ও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে, তখন ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন ইন্সপেক্টর ছগির। নিজের পেশাদারিত্ব, মাঠপর্যায়ের নেটওয়ার্ক ও বিচক্ষণতাকে কাজে লাগিয়ে তাৎক্ষণিক সাঁড়াশি অভিযানে নামেন তিনি। ঘটনার মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যেই পলাতক ওই শীর্ষ আসামিকে পুনরায় গ্রেপ্তার করে আস্থার সংকট দূর করেন এবং বিএমপির ভাবমূর্তি রক্ষা করেন।
শুধু তাই নয়, বরিশাল নগরীর আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্যতম শীর্ষ সন্ত্রাসী, ছিনতাইকারীদের গডফাদার ও ২৬ মামলার কুখ্যাত ভাড়াটে খুনি আকাশ হাওলাদার ওরফে ‘কালা মাসুদ’কে আইনের আওতায় আনা ছিল ইন্সপেক্টর ছগির হোসেনের কর্মজীবনের অন্যতম এক শ্বাসরুদ্ধকর ও সফল অধ্যায়। দীর্ঘ এক মাসের নিরবচ্ছিন্ন, সুকৌশলী ও প্রযুক্তিগত ছক এঁকে তিনি এই কুখ্যাত অপরাধীকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হন। টাকার বিনিময়ে ‘টার্গেট কিলিং’ ও নগরজুড়ে অর্ধশত চুরি-ছিনতাইয়ের মূলহোতা কালা মাসুদ গ্রেপ্তারের পর ছগির হোসেন সর্বস্তরের মানুষের মাঝে ব্যাপক প্রশংসিত ও পুরস্কৃত হন।
বিএমপির ডিবি পুলিশে কর্মরত থাকাকালীন ইন্সপেক্টর ছগির হোসেনের নেতৃত্বে কেডিসি বালুর মাঠ এলাকার রাজ্জাক স্মৃতি কলোনিতে পরিচালিত অভিযানটি ছিল বিএমপির ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম মাদকবিরোধী সফল অপারেশন। সেখান থেকে রেকর্ড পরিমাণ ৬৬ কেজি গাঁজা উদ্ধার করে সুসংগঠিত মাদক সিন্ডিকেটের পুরো চেইন অব কমান্ড ভেঙে দেন তিনি।
এছাড়াও বরিশালের শীর্ষ মাদক সম্রাট ও শায়েস্তাবাদের কথিত মেম্বার রাসেল ওরফে ‘মাদক রাসেল’কে বিপুল পরিমাণ অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র, তাজা গুলি ও বিপুল পরিমাণ মাদকসহ গ্রেপ্তার ছিল তাঁর কর্মজীবনের আরেকটি আলোচিত অপারেশন। এই অভিযানের পর বরিশালের অপরাধ জগতের বড় ধরনের বড় ধাক্কা লাগে এবং অস্ত্র ও মাদকের অবৈধ রুটগুলো বন্ধ হয়ে যায়।
কেবল ডিবি পুলিশেই নয়, এর আগে কাউনিয়া ও কোতোয়ালি মডেল থানায় দীর্ঘ সময় কর্মরত থাকাকালীনও তিনি সফলতার গভীর স্বাক্ষর রেখেছেন। ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত কাউনিয়া থানায় পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি ওই এলাকাকে অপরাধমুক্ত ও জুয়া-মাদকমুক্ত করতে মাঠপর্যায়ে কঠোর ভূমিকা রাখেন। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বে বহু বছরের পলাতক ও পরোয়ানাভুক্ত দুর্ধর্ষ আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়।
পরবর্তীতে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কোতোয়ালি মডেল থানায় পরিদর্শক (তদন্ত) হিসেবে যোগদানের পর নগরীর চাঞ্চল্যকর চুরি, দিনদুপুরে ছিনতাই এবং উঠতি বয়সী ‘কিশোর গ্যাং’-এর অপতৎপরতার বিরুদ্ধে বেশ কিছু তাৎক্ষণিক ও সফল অ্যাকশন পরিচালনা করে সাধারণ নগরবাসীর আস্থা ও ভালোবাসা অর্জন করেন।
স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র, ভুক্তভোগী পরিবার ও সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বরিশাল নগরীতে যেকোনো বড় ধরনের অপরাধ, চুরি, ডাকাতি, চাঁদাবাজি কিংবা মাদক সিন্ডিকেটের খবর পেলেই যেখানে সাধারণ মানুষের প্রধান ভরসার নাম হয়ে উঠতেন ইন্সপেক্টর ছগির হোসেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ও অপরাধ দমনে তাঁর এই আপসহীন ও আপিলহীন ভূমিকার কারণে সাধারণ মানুষ যেখানে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলত, সেখানে অপরাধী চক্রের কাছে তিনি ছিলেন এক মূর্তিমান আতঙ্ক।
সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও অভিজ্ঞ মহল মনে করছেন, র্যাবের মতো এলিট ফোর্সে ইন্সপেক্টর ছগির হোসেনের অন্তর্ভুক্তি দেশের সামগ্রিক অপরাধ দমন, জঙ্গি দমন ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় আরও বড় পরিসরে ভূমিকা রাখার সুযোগ তৈরি করবে। তবে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, মাঠপর্যায়ের গোয়েন্দা নজরদারি ও চেইন অব কমান্ডে তাঁর মতো একজন সাহসী, কর্মঠ, নির্লোভ ও নিষ্ঠাবান অফিসারের অভাব সহজে পূরণ হওয়ার নয়। তাঁর এই বদলি বিএমপির অপরাধ দমন কার্যক্রমে সাময়িকভাবে হলেও এক বিশাল ঘাটতি ও শূন্যতা তৈরি করল বলে মনে করছেন বরিশালের সচেতন সুধীসমাজ
লিড নিউজ অনলাইন ডেস্ক, জাতীয়, তথ্যপ্রযুক্তি


