ডিসেম্বরের মধ্যে সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা না করলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখা কঠিন হবে বলে ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি। গতকাল বৃহস্পতিবার দলের সর্বোচ্চ নীতিনিধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির এক জরুরী সংবাদ সম্মেলনে এই অবস্থান ঘোষণা করেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তিনি বলেন, জুলাই-ছাত্র গণঅভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষাকে ধারণ করে মানুষের হারানো গণতান্ত্রিক অধিকার, সাংবিধানিক অধিকার, মানবাধিকারসহ ভোটাধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যথা শিগগিরই সম্ভব জনআকাক্সক্ষা অনুযায়ী একটি নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার প্রতিষ্ঠা করাই এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। আমরা একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে এবছরের ডিসেম্বরের মধ্যে একটি জাতীয় সংসদ গঠনের জন্য অবিলম্বে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণার দাবী জানাচ্ছি। এই সর্বোচ্চ জনআকাক্সক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানতম এজেন্ডা হওয়া উচিত বলে জনগণ মনে করে। এর অন্যথা হলে হলে জনগণের দল হিসাবে বিএনপির পক্ষে এই সরকারের প্রতি সহযোগিতা অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।
গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে স্থায়ী কমিটির এই জরুরী সংবাদ সম্মেলন হয়। এতে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি, অন্তবর্তীকালীন সরকারের কতিপয় উপদেষ্টা ও নিরাপত্তা উপদেষ্টার ‘বিতর্কিত’ কার্যক্রম, সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে শপথ নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করাসহ বিভিন্ন বিষয়ে দলের অবস্থান তুলে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ ছোট করার কথাও বলেছে বিএনপি। খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, যেহেতু, একটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করাই এই সরকারের প্রধান কাজ। তাই মাথাভারি উপদেষ্টা পরিষদ না রেখে শুধুমাত্র রুটিন ওয়ার্ক (দৈনন্দিন কার্যক্রম) পরিচালনার জন্য একটি ছোট আকারের উপদেষ্টা পরিষদ রাখাই বাঞ্ছনীয়। একই সঙ্গে উপদেষ্টা পরিষদের বিতর্কিত উপদেষ্টাগণসহ প্রধান উপদেষ্টার নিরাপত্তা উপদেষ্টাকে অব্যহতি দেয়ার দাবি জানিয়েছে বিএনপি।
ড. মোশাররফ বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের যে সমস্ত উপদেষ্টাগণ একটি নুতন রাজনৈতিক দলের সাথে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে জড়িত বলে সবাই জানে ও বুঝে, উপদেষ্টা পরিষদে তাদের উপস্থিতি সরকারের নির্দলীয়, নিরপেক্ষ পরিচিতিকে ক্রমাগত প্রশ্নবিদ্ধ করে চলেছে বলেই সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষার্থে তাদেরকে অব্যাহতি প্রদান করা প্রয়োজন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার (খলিলুর রহমান) বুধবারের বক্তব্য আবারও নতুন বির্তকের জন্ম দিয়েছে, সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষার্থে তাকে অব্যাহতি প্রদান করতে হবে। ফ্যাসিবাদের দোসর কয়েকজন উপদেষ্টাকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি আমরা ইতোপূর্বে অনেক বার উত্থাপন করেছি।
খন্দকার মোশাররফ বলেন, ঐক্যের স্বার্থে অন্তর্বর্তী সরকারকে সর্বোচ্চ নিরপেক্ষতার অবস্থান বজায় রাখার কথা ছিল। কিন্তু লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, কোন কোন মহলের রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করাই যেন সরকারের কর্মপরিকল্পনার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বক্তব্য আমরা বারবার উচ্চারণ করেছি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সা¤প্রতিক কিছু কর্মকাÐে সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। তাদের সরকারের নিরপেক্ষতা বজায় রাখার স্বার্থে বিতর্কিত কয়েকজন উপদেষ্টা যাদের বক্তব্যে এবং কর্মকাÐে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে, এমন বিতর্কিত উপদেষ্টাদের সরিয়ে দেয়ার দাবী আমরা তুলেছিলাম। অন্তর্বর্তীকালীন অস্থায়ী সরকারের একমাত্র ম্যান্ডেট হচ্ছে একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা। অথচ সরকারের মুখপাত্র হিসাবে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব বলেছেন যে, এই সরকারের সবকিছু করার ম্যান্ডেট রয়েছে।
বিতর্কিত উপদেষ্টা কারা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি সংবাদ সম্মেলনে বলেছি, তাদের নাম না বললেও সকলে আপনারা তাদেরকে চিনেন।
মানবিক করিডোরের বিষয়ে নির্বাচিত সরকার সিদ্ধান্ত নেবে জানিয়ে ড. মোশাররফ বলেন, মানবিক করিডোর এবং চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে সরকারের বিভিন্ন বক্তব্য ও কর্মকান্ডে জাতীয় স্বার্থ রক্ষিত হচ্ছে কিনা সেটা সর্বাগ্রে বিবেচনায় নেয়া দরকার। এমন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ও দীর্ঘ মেয়াদী নীতি নির্ধারনী কোন সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার অন্তর্বর্তীকালীন অস্থায়ী সরকারের আছে বলে এদেশের জনগণ মনে করে না। দেশের নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট স্পর্শকাতর ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার বিবেচনায় নিয়ে যাতে দেশে অস্থিতিশীল কোন পরিবেশ সৃষ্টি না হয় সেদিকে লক্ষ্য রেখে এই বিষয়ে যে কোন সিদ্ধান্ত কেবল জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সরকার কর্তৃক জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে গৃহীত হওয়াই সমীচীন।
সংস্কার-বিচার প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া, তাই সংস্কার ও নির্বাচন প্রক্রিয়া দু’টাই একই সাথে চলতে পারে। পতিত ফ্যাসিবাদী শক্তির এবং ব্যক্তির অর্থাৎ দল এবং মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচার প্রক্রিয়া চলমান থাকবে। যে বিষয়গুলো এই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আপনাদের সামনে উপস্থাপন করা হচ্ছে, সে বিষয়গুলো আমাদের আগের প্রস্তাব ও পরামর্শের মত উপেক্ষিত হলে তা হবে দুর্ভাগ্যজনক। সেক্ষেত্রে অনিবার্যভাবেই বিএনপি অন্তর্বর্তী সরকারকে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে কিনা তা পূনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হবে।’
বিএনপির এই নেতা বলেন, দেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার স্বার্থে, আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি রোধকল্পে, নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য জনগণের ক্রয় ক্ষমতার নাগালের মধ্যে রাখতে, বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্যে গতিশীলতা আনায়নের লক্ষ্যে নির্বাচন পূর্ব সময় পর্যন্ত সরকার ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন, এই প্রত্যাশা আমাদের সকলের।
এনসিপির নির্বাচন কমিশন ঘেরাও প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে একটি সংস্কার সনদ তৈরীর প্রক্রিয়ার মধ্যেই আলাপ-আলোচনা অব্যাহত থাকা সত্বেও একই বিষয় গুলো নিয়ে এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দাবীতে একটি দলের নির্বাচন কমিশন ঘেরাও কর্মসূচী আমাদেরকে এবং সরকারকে বিব্রত করে। সার্চ কমিটির মাধ্যমে আইনানুযায়ী নির্বাচন কমিশন গঠিত হলেও একটি মহল নির্বাচন কমিশন পূনর্গঠন চায়। সরকার সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সমূহ পূণর্গঠনের প্রক্রিয়ায় সব ক্ষেত্রে আমাদের মতামত না নিলেও নির্বাচন কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে সকল পক্ষকে অন্তর্ভূক্ত করে এই কমিশন গঠন করেছে। কিন্তু ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সংক্রান্ত বিষয়ে আদালতের রায় অনুযায়ী গেজেট নোটিফিকেশন করায় নির্বাচন কমিশনকে অন্যায় ও অযৌক্তিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব হচ্ছে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা। এমন বাস্তবতায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দাবিতে নির্বাচন কমিশন ঘেরাও করার বিষয়টি উদ্দেশ্যমূলক ও রহস্যজনক।
স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান বলেন, আজকে এই সংবাদ সম্মেলনে আমরা অসহযোগিতার কথা বলিনি। আমরা বলেছি যে, সরকার যে পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে, যেখানে আমরা প্রথম দিন থেকে প্রকাশ্যে বলে আসছি যে, সরকারকে আমরা সহযোগিতা করতে চাই, তাদেরকে যৌক্তিক সময় দিতে চাই নির্বাচন করার জন্য। আমরা এখন বলছি যে, এরকম কর্মকান্ডের ফলোশ্রুতিতে সেই সহযোগিতা করাটা কঠিন হবে।
স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আমাদের বলা হয়েছে, আমরা ডিসেম্বরে নির্বাচনের দিকে যাচ্ছি, জাতি চাচ্ছে, সবার প্রত্যাশা ডিসেম্বরে নির্বাচন। সেটাকে মাথায় রেখে একটা কেয়ারটেকার মোডের দিকে যাওয়ার কথা। কেয়ার টেকার মোডের দিকে যদি আমরা এগিয়ে যাই তাহলে এই যে এডভাইজিারি কমিটি আছে সেটাকে কমিয়ে কেয়ারটেকার মোডে যেতে হবে। আমরা উপদেষ্টার সংখ্যা কমানোর কথা বলেছি, বাড়ানোর নয়। এখন আপনি যথন কেয়ারটেকার মোডে যাবেন, সংখ্যা আমাদের জানা আছে, কেয়ারটেকার সরকারে উপদেষ্টার সংখ্যা ১০জন ছিলো। আর যারা যারা বিতর্কিত তাদেরকে বাদ দিয়ে আপনাকে সেদিকে যেতে হবে। এটা আমরা নিরপেক্ষ নির্বাচনের কথা বলছি, সরকারের নিরপেক্ষতার কথা বলছি। আর নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করতে হবে, এটাই আমাদের মূল কথা। সংবাদ সম্মেলনে আরও ছিলেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ।
জাতীয়