শরীরের কষ্ট এক জিনিস আর মনের প্রশান্তি আরেক জিনিস। যদি আল্লাহকে বান্দা স্মরণ করে, তাহলে শরীরে জ্বর আসতে পারে বটে, কিন্তু সেই জ্বরের কারণে মনের মধ্যে পেরেশানী আসবে না। সে এটা বলবে না, এমন কী পাপ করলাম যে, আমার জ্বর হলো! বরং বলবে, আল্লাহ! এ জ্বর তুমিই দিয়েছ, ভালো তুমিই করতে পারো। আল্লাহ এই জ্বরের মধ্যে যদি কোনো খায়ের থাকে, আমি তাতে খুশি। তবে আল্লাহ! আমি তো দুর্বল বান্দা। সইতে পারি না। আমার শরীর দুর্বল, আল্লাহ তুমিই ভালো করতে পারো, আমাকে তুমি সুস্থ করে দাও। সে সম্পূর্ণভাবে আল্লাহ তা‘আলার অভিমুখী হবে। তার মন অশান্ত অস্থির হবে না।
মানুষের পেরেশানী নানা রকম; রোগব্যাধির পেরেশানী, আয়-রোজগারের পেরেশানী, মামলার পেরেশানী, মানুষের দুর্ব্যবহারের পেরেশানী, সন্তান অবাধ্য হলে সেই পেরেশানী। আল্লাহ অভিমুখী হলে, আল্লাহর যিকির করলে এসব পেরেশানীই দূর হয়ে যাবে। আবার অনেক সময় পেরেশানী দেখা দেয় আকীদা-বিশ্বাসেও। আল্লাহ-রাসূলের প্রতি বিশ্বাস টলে যায়। ঈমান যদি মজবুত না হয়, তুচ্ছ তুচ্ছ কারণে বিশ্বাস-ঈমান টলে যায়।
আল্লাহর যিকিরে যেমন মন স্বস্তি পায়, মন স্থির হয়, তেমনি ঈমানও মজবুত হয়। যে অন্তরে আল্লাহর যিকির নেই, সে অন্তর পেরেশান হয়, অস্থির হয়। আবার অন্তরে আল্লাহর যিকির না থাকলে ঈমানও দুর্বল হয়ে যায়। শয়তান সহজেই ওয়াসওয়াসা দিতে পারে। কুরআন তিলাওয়াতও যিকির; বরং সবচেয়ে বড় যিকির। যে নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করে না। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহদ-এর যিকির করে না, আল্লাহদ আল্লাহ-এর যিকির করে না, সুবহানাল্লাহদ আলহামদু লিল্লাহ পড়ে না, এর যিকির করে না, তার মন তো পেরেশান হবেই।
যে ব্যক্তি নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করে, তা যতটুকুই হোক, দুই পৃষ্ঠা হোক, এক পৃষ্ঠা হোক; কিন্তু ৩০ দিনের কোনোদিন বাদ যায় না। মোটকথা, আপন সামর্থ্য অনুযায়ী নিয়মিত যে কুরআন তিলাওয়াত করে, সে কখনো ঈমানের দুর্বলতার শিকার হবে না।
আল্লাহ তা‘আলা বলে দিয়েছেনÑ ‘আল্লাহর যিকিরে মন মুতমাইন হয়ে যায়; শান্ত ও স্থির হয়ে যায়। কোনো সন্দেহ, কোনো খটকা মনে ঢুকতে পারে না। কুরআন তিলাওয়াতের দ্বারা অশান্ত-অস্থির মনে শান্তি ও স্থিরতা এসে যায়। মন প্রশান্ত হয়ে যায়। কোনো নাস্তিক্যবাদী কথাবার্তায় মন টলে যায় না। শয়তান ওয়াসওয়াসা সৃষ্টি করে বিপথগামী করতে পারে না। এটা মহৌষধ। কুরআন মাজীদ সম্পর্কে বলা হয়েছে : অন্তরের রোগ-ব্যাধির উপশম।’ (সূরা ইউনুস-৫৭)
কুরআন হলো অন্তরের শিফা। এটা আরোগ্য, অন্তরের নিরাময়। মনে যে-কোনো সন্দেহ দেখা দেবে, কুরআন দ্বারা তার নিরাময় হয়ে যাবে, খটকা দূর হয়ে যাবে।
কাজেই কুরআনের প্রতি উদাসীন থাকা কোনো মুমিনের জন্য কিছুতেই বাঞ্ছনীয় নয়। এর পরিণাম বড় ভয়াবহ। সে বেঈমানীর শিকার হয়ে যেতে পারে। আর তার পরকালও হতে পারে ভয়ানক। কারণ কুরআন ত্যাগকারী সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর সামনে ফরিয়াদী হবেন। আল্লাহ বলেনÑ ‘আল্লাহর রাসূল (সা.) কিয়ামতের দিন বলবেন, আল্লাহ! আমার কওম কুরআনকে পরিত্যক্ত করে রেখেছিল।’ (সূরা ফুরকান-৩০) সুতরাং আমরা আল্লাহর সব রকম যিকিরে সব সময় রত থাকব ইন শা আল্লাহ।
এক যিকির তো হলো, আল্লাহ আল্লাহদ সুবহানাল্লাহ আলহামদু লিল্লাহ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহুদ আল্লাহু আকবার পড়া। এমন যিকিরও করব। আবার মসনূন দুআ পড়ব। এটাও গুরুত্বপূর্ণ যিকির। যে কোনো কাজের আগে-পরে যে দুআগুলো আছে, ঘুমের আগের দুআ, পরের দুআ, ঘরে প্রবেশের দুআ, বের হওয়ার দুআ, প্রত্যেক কাজের আগে-পরের দুআ, যেমন : বিসমিল্লাহ বলে খাওয়া, শেষ করে আলহামদু লিল্লাহ পড়া এই দুআগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ যিকির। তাই সব কাজের আগে-পরের দুআগুলোও আমরা পড়ব।
এছাড়া যত ইবাদত-বন্দেগি আছে, নামায, রোযা, হজ্ব, যাকাত ও কুরআন তিলাওয়াত এ সবই আল্লাহর যিকির। নামায সম্পর্কে এসেছেÑ ‘নিশ্চয়ই নামায অশ্লীল ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহর যিকিরই তো সর্বাপেক্ষা বড় জিনিস।’ (সূরা আন কাবূত-৪৫) এ নামাযের সারবস্তু হলো, আল্লাহর যিকির। শুরুই হয় দআল্লাহু আকবারদ বলে। এরপর এর ভেতরে যা আছে, সবই যিকির। প্রথমে সানা, সূরা ফাতেহা, এরপর তিলাওয়াত, রুকু-সিজদা সব আল্লাহর যিকির।
আল্লাহর যিকির যেমন মুখে হয়, ঠিক তেমনি কাজের দ্বারাও হয়। এ রুকু করাটা, সিজদা করাটা, এর ভেতরে যদি তাসবীহ-দুআ না-ও পড়ে, তাও এটা আল্লাহর যিকির। আল্লাহর হুকুম মানাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ যিকির। সাঈদ ইবনে জুবাইর (রাহ.) বলেছেন, দযে-ব্যক্তি আল্লাহর যিকির করে, কিন্তু আল্লাহর হুকুম মানে না, সে সত্যিকারের যাকির নয়। সত্যিকার যিকিরওয়ালা নয়। তা সে যতই তাসবীহ পাঠ করুক না কেন। (দ্র. তাফসীরে কুরতুবী, সূরা বাকারার-১৫২নং আয়াতের তাফসীর)। অতএব আল্লাহর হুকুম মানাটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যিকির। এমনিভাবে কুরআন তিলাওয়াত, এ তো খুবই মহান যিকির। সব রকমের যিকির আমরা করব।
ধর্ম